সাংহাইতে মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি

চীনে সামাজিক ব্যবসা সপ্তাহ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে দেশটিতে নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সাংহাইতে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান ও বৈঠকে যোগদান করেন। দিনের শুরুতে তিনি দেশটির অন্যতম খ্যাতনামা পাবলিক স্কুল “কাও ইয়াং নাম্বার-টু হাই স্কুল” পরিদর্শন করেন। স্কুলটির প্রিন্সিপাল মি. ওয়াং ইয়াং, যিনি একজন সফল শিক্ষাবিদ হিসেবে চীনে সমধিক প্রসিদ্ধ, একই সাথে দেশটির উচ্চ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে “ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল প্র্যাকটিস” এর পরিচালক। তিন বছর পূর্বে তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে “সামাজিক ব্যবসা” ও “গ্রামীণ বাংক” অন্তভর্‚ক্ত করেন এবং ছাত্রদের জন্য একটি সুসজ্জিত “গ্রামীণ ল্যাব” গড়ে তোলেন। এর ছাত্ররা বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের জন্য নিয়মিতভাবে গ্রামীণ চায়নার শাখাগুলো পরিদর্শন করতে যায়।

প্রত্যেক ছাত্রকে গ্রামীণ চায়নার একজন ঋণীর সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়, যাঁকে গ্রামীণ চায়নার মাধ্যমে এই উদ্দেশ্যে সৃষ্ট একটি গবেষণা প্রকল্পের তহবিল থেকে ঋণ প্রদান করা হয়। ছাত্রকে বছরে কমপক্ষে একবার এই ঋণীর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে হয়। এরপর তাকে নিয়মিতভাবে টেলিফোনে এই ঋণীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়, তাঁর খোঁজ-খবর নিতে হয় এবং তাঁর কোনো সহায়তার প্রয়োজন হলে সহায়তা করতে হয়।

স্কুলটি পরিদর্শনের সময়ে প্রফেসর ইউনূসকে এই চমৎকার গ্রামীণ ল্যাবটি ঘুরিয়ে দেখান হয়। ছাত্ররা পালা করে তাঁর কাছে ল্যাবটির বিভিন্ন অংশের বর্ণনা দেয়। গ্রামীণ ব্যাংকের কেন্দ্র মিটিং কীভাবে অনুষ্ঠিত হয় তার একটি সুন্দর প্রদর্শনী ল্যাবটির এক অংশে রয়েছে। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদানকালে প্রফেসর ইউনূস সামাজিক ব্যবসা ও গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য তাদেরকে অবহিত করেন।

প্রিন্সিপাল ওয়াং ইয়াং প্রফেসর ইউনূসেকে জানান যে, এই ল্যাব থেকে পাশ করা ছাত্ররা দেশটির সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।

প্রফেসর ইউনূস সাংহাইয়ের পুওটো জেলার গভর্ণর মি. ঝাও মিনহাওয়ের আমন্ত্রণে পুওটো সফর করেন। জেলাটিতে গ্রামীণ মডেলে ঋণ কর্মসূচি চালু বিষয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। বিশেষ করে দু’টি বিষয় নিয়ে তাঁরা বিশদ আলোচনা করেন। এর একটি ছিল গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালুর জন্য লাইসেন্স প্রাপ্তি। অপরটি ছিল শাখার আকার ও সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রয়োজনীয় তহবিলের যোগান। তাঁদের এই বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন জেলা ট্রেজারী ব্যুরো, জেলা ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অফিস ও জেলা ফাইনান্সিয়াল অফিসের প্রধানগণ। এ বিষয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরীর উদ্দেশ্যে গ্রামীণ চায়নার সাথে একত্রে কাজ করার জন্য জেলা ট্রেজারী ব্যুরোর প্রধানকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

সাংহাইয়ের ডেপুটি মেয়র মি. উ কিং সাংহাই সিটি হলে অবস্থিত তাঁর কার্যালয়ে প্রফেসর ইউনূসের সম্মানে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন। উল্লেখ্য যে, মি. কিং সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান থাকাকালে তিন বছর পূর্বে প্রফেসর ইউনূসের সাথে ঢাকায় ইউনূস সেন্টারে সাক্ষাৎ করেছিলেন। নৈশভোজের পূর্বে তাঁরা একটি বৈঠকে মিলিত হন যেখানে প্রফেসর ইউনূসের সহযোগিতায় সাংহাইতে সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালু নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। এই বৈঠকে আরো যোগদান করেন সাংহাই ফাইনান্সিয়াল সুপারভিশন এন্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিসের মহাপরিচালক মিস জিই দং এবং ইকোনমিক এন্ড ইনফরমেশন কমিটির উপ-পরিচালক মি. রুয়ান লি।

ডেপুটি মেয়র সাংহাইতে যত শীঘ্র সম্ভব গ্রামীণ চায়নার কর্মসূচি চালুর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। মহাপরিচালকও ডেপুটি মেয়রের প্রস্তাবে পূর্ণ সমর্থন দেন। গ্রামীণ চায়না এ বিষয়ে একটি ধারণা-পত্র ও একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরীর প্রস্তাব দেয়।

এই বৈঠকে গৃহীত আরেকটি সিদ্ধান্ত ছিল সাংহাই নগরীতে প্রফেসর ইউনূসের সহযোগিতায় আর্থিক অন্তর্ভূক্তি ও সামাজিক ব্যবসার উপর একটি প্রায়োগিক গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রিন্সিপাল ওয়াং ইয়াংকে এ বিষয়ে একটি ধারণা-পত্র তৈরী করে তা মেয়রের অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করতে অনুরোধ করা হবে।

Spread the love

Facebook Comments