শোনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা

বিদেশের উচ্চশিক্ষার সময় বিভিন্ন দূর্যোগ দেখেছি। সাইক্লোন, বন্যা এসব। কিন্তু পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যাবে করোনার কারণে এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। শুধু আমি নয়, সবার জীবনেই এ এক অন্য অভিজ্ঞতা।

কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১৯ এ ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) এর সহকারি পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করি।

কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি রেটিংয়ে এটি বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম হিসেবে তালিকাভুক্ত। রাজধানীর মাদানি এভিনিউয়ের ইউনাইটেড সিটিতে ২৫ বিঘা জমিতে রয়েছে এর ১৩ তলাবিশিষ্ট নিজস্ব ক্যাম্পাস। এর মধ্যে রয়েছে ২০ বিঘার বিশাল সবুজ মাঠ। অধ্যাপক ড. চৌধুরী মফিজুর রহমান জুলাই, ২০১৮ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী ইউনাইটেড গ্রুপ ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় । ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিণত করা উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য । ইউনাইটেড গ্রুপ এর ২২টি সহযোগী প্রকল্পের মধ্যে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অন্যতম। এই প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে আমি সত্যি অনেক গর্বিত।

আমরা সবাই ভাবছিলাম এই দূর্যোগে কীভাবে দূর্গত মানুষের পাশে দাড়ানো যায়। সে লক্ষ্যে ইউনাইটেড গ্রুপ অভাবগ্রস্থদের মধ্যে ৩৫০ টন খাবার বিতরণের উদ্যোগ নেয়। ১৩ এপ্রিল এ ইউআইইউ-এর ক্যান্টিন এবং নিচতলায় খাদ্য মোড়কজাত করা হয়। এছাড়াও করোনাভাইরাস মোকাবিলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন ইউনাইটেড গ্রুপ। ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে এ চেক তুলে দেওয়া হয়। ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ চেক তুলে দেন। চেক গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। এ সময় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমরা আশা করছি এখানেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না। আরও ঘনিষ্ঠভাবে আমরা দূর্গতদের পাশে থাকতে চাই। সে পথচলায় আপনাদের পাশে চাই।

এই দু:সময়ে শুধু আমরাই নয় দূর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই। এদের মধ্যে বলতে পারি বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নাম। ‘এক টাকায় আহার’ এর মতো জনবান্ধব কর্মসূচির উদ্যোক্তা এই ফাউন্ডেশন। এই করোনা সংক্রমণের মধ্যেও তারা মাঠে আছে। নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে তারা।

এই ফাউন্ডেশনের করোনাভাইরাস মোকাবিলা কার্যক্রম প্রসঙ্গে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ঢাকা বিভাগের পরিচালক সালমান খান ইয়াসিন গণমাধ্যমে জানান, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে মার্চ মাসের শুরু থেকেই বিদ্যানন্দের বাসন্তী গার্মেন্টসে বানানো মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার সামগ্রী বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করছিলাম। তবে ১৫ মার্চের পর থেকে আমরা পুরোদমে মাঠে সক্রিয় হই। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে দিনে-রাতে ছুটেছি জীবাণুনাশক ছিটাতে। ১৮ মার্চের পর দেশের পরিস্থিতি যখন আরও ভয়াবহ রূপ নেয় তখন ৬০ জন সদস্যকে ভাগ করে ৩০ জন করে আমরা দুটি দল গঠন করি। তারা দুই শিফটে কাজ করছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার লিটার জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিচ্ছি। ঢাকার মধ্যে যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন তারা কল করে জানালেই তাৎক্ষণিক খাবার পৌঁছে দিচ্ছি। এছাড়া সারা দেশে চিকিৎসকদের সুরক্ষার জন্য প্রায় ১ হাজার পিপিই প্রদান করেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। শুধু তাই নয়, দেশের দিনমজুর গরিবদের মাঝে সংকটময় এই সময়ে ত্রাণ বিতরণ করার কথাও জানান সালমান ইয়াসিন।

একই সঙ্গে আমরা দেখছি হোমমেড ফুড ও হোমমেড গ্রোসারি ডেলিভারি কোম্পানি রাঁধো মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। রাঁধো গত ১৫ দিনে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলেছে জীবাণুনাশক ও রান্না করা খাবার নিয়ে। অভুক্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতেই তাদের এই আয়োজন। গত ১৫ দিনে প্রতিষ্ঠানটি ৪০ হাজার মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে সক্ষম হয়েছে।

এই যে দূর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো- আমি মনে করি এটিই মানুষের ধর্ম। হয়ত সবার কথা বলতে পারিনি। অনেকের নাম বাদ গেছে। তবু স্বীকার করি তাদের অবদান। মানবতার ডাকে সাড়া দেওয়ায় সবাইকে অভিনন্দন। আশা করি, এই জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা জিতবো। মানুষের কানে, মানুষের প্রাণে মঙ্গল বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া মানুষগুলো তখন বীরের মর্যাদা পাবেন। আমরা সুসময়ের অপেক্ষায়। সুসময় আমাদের সব দু:খ ভুলিয়ে দেবে।

লেখক : জেনিফার হোসেন
সহকারি পরিচালক, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি

Spread the love

Facebook Comments