লকডাউনহীন আকাশে ঘুড়ি

খুব বিচিত্র মানুষের পৃথিবী। এক দিকে চলছে মৃত্যুর মিছিল। অন্যদিকে জীবনের অন্য রঙ ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা কিছু মানুষের। এভাবেই জীবন চলে যায় পার্থিব আর অপার্থিবের মিশেলে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবী এখন বিপর্যস্ত। লক ডাউনে দেশ, সঙ্গে পুরো পৃথিবী। বাসায় কিছুই করার নেই অনেকের। সেই মানুষগুলোই এখন ফিরে গেছেন তাদের শৈশবে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এ প্রজন্মের শিশুরা। আর এই দুই প্রজন্মের হাতে এখন নাটাই। করোনাকালে ঢাকার আকাশ এখন ঘুড়িময়। যা এক ভিন্ন রূপ দিয়েছে নগর জীবনকে।

ঘুড়িপ্রেমীরা জানান, আমাদের দেশে পঙ্খীরাজ, মালাদ্বার, কাউঠাদ্বার, চাপালিশ, চশমাদ্বারসহ বিভিন্ন নামের ঘুড়ি আছে। তবে ঘুড়ির চেয়েও বেশি দৃষ্টি কাড়ে এর লেজ। ঘুড়ি অনেক আকৃতির ও রং-বেরঙের হয়ে থাকে। এর সঙ্গে ঘুড়ি উড়ানোর লাটাইয়ের নামও বেশ আকর্ষণীয়। যেমন- বাটিওয়ালা, মখুবান্ধা, মুখছাড়া ইত্যাদি।

বাসায় বসে থেকে বিরক্ত হয়ে শৈশবে ফিরে গেছেন অনেকে। এরপর ছাদে উঠে আকাশে ভাসিয়েছেন ঘুড়ি। এমন একজন শোয়েব আহমেদ। তিনি পেশায় ব্যাংকার। থাকেন ঢাকার মিরপুরে। লক ডাউনের দিনগুলিতে ঘুড়ির প্রেমে মজেছেন তিনি।

শোয়েব বলেন, ছোটবেলায় ঘুড়ি ওড়াতাম খোলা মাঠে। এখন শহরে মাঠ নেই। তাই ছাদে ঘুড়ি ওড়াচ্ছি। এখন সবচেয়ে ভালো লাগছে আমার ছেলেও আমার সাথে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। আমরা দু’জন মিলে প্রতিদিন বিকালে ঘুড়ি উড়াই। খুব ভালো লাগে।

করোনার জন্য এমন শৈশবে ফেরা হচ্ছে অনেকের। কেউ কেউ এই শখ নিয়ে অনেক সিরিয়াস। নিজের হাতে কাগজ দিয়ে ঘুড়ি বানাচ্ছেন। সুতোয় মাঞ্জা দিচ্ছেন। পুরোনো শহরে অনেক জায়গায় চলছে ঘুড়ির লড়াই। এ কোনো চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব নয়। এ করোনায় বন্দি জীবনে একটু যেন আকাশে উড়ার স্বাদ নেওয়া।

এভাবেই হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা শহর নিজের এক হারানো ঐতিহ্যের কাছে ফিরে গেছে। যে শহরটির নবাববাড়িকে কেন্দ্র করে চলতো গত শতকের সম্ভ্রান্তদের ঘুড়ি ওড়ানো। সে শহরটি এখন সাধারণের ঘুড়ি ওড়ানোর শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। যারা ঘুড়ি ওড়ায়নি সেই নতুন প্রজন্ম বাবার হাত ধরে শিখছে ঘুড়ি ওড়ানো। এ যেন এক পরম্পরা। করোনাকালে ঘুড়ির প্রত্যাবর্তন সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। জমিনে লক ডাউন থাকতে পারে। কিন্তু আকাশ এসবের উর্দ্ধে। তাই সেখানেই লক ডাউনের প্রোটোকল না মেনে উড়ছে ঘুড়ি।

Spread the love

Facebook Comments