যশোরের শাড়ি ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

যশোরে নষ্টের পথে কমপক্ষে ৭৫ কোটি টাকার শাড়ি কাপড়। ঈদ ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সংগ্রহ করা এসব শাড়ি দীর্ঘদিন ধরে দোকানে পড়ে থাকার কারণে নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এখনই দোকান খুলে হাওয়া বাতাস লাগাতে না পারলে এসব শাড়ি কাপড় ফেলে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। একেবারেই সর্বস্বান্ত হতে হবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া শ’ শ’ ব্যবসায়ীকে। একইসাথে বেকার হয়ে পড়বেন এক হাজারেরও বেশি কর্মচারী।

পুঁজি রক্ষায় আগামী ৫ মে থেকে ঈদ পর্যন্ত শাড়ি কাপড়ের দোকানগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে হলেও খোলার অনুমতি চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যশোর শাড়ি কাপড় ব্যবসায়ী সমিতি কাপুড়িয়াপট্টির সভাপতি তন্ময় সাহা জানিয়েছেন, তাদের সমিতিতে ৩৫ জন সদস্য রয়েছেন। যাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কাপুড়িয়া পট্টিতেই। যশোরের সবচেয়ে বড় শাড়ি কাপড়ের দোকানগুলো এখানে। এই ৩৫ দোকানের বাইরে হাটচান্নি, মুজিব সড়ক, শেখহাটিসহ বিভিন্ন মার্কেটে আরও দুশ’ শাড়ি কাপড়ের দোকান রয়েছে।

কাপুড়িয়াপট্টির ৩৫ টি দোকানে ঈদ এবং পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকার শাড়ি কাপড় তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। এই ৩৫ টি দোকানে কর্মরত রয়েছেন সাড়ে তিনশ’র মতো কর্মচারী। এসবের বাইরে আরও যে দুশ’র মতো দোকান রয়েছে সেগুলোতে কমপক্ষে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার বিভিন্ন ডিজাইন ও মানের শাড়ি কাপড় আনা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, যশোরের শাড়ি কাপড়ের দোকানগুলোতে এক হাজার থেকে ১২শ’ কর্মচারী কাজ করেন। বড় দোকানগুলোতে কর্মচারী বাবদ মাসে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর বাইরে ঘরভাড়া ১৫ থেকে ৩৫ হাজার এবং বিদ্যুৎ বিল বাবদ দু’ থেকে সাত হাজার টাকা খরচ হয়ে থাকে। ছোট দোকানগুলোতে এই খরচের মাত্রা খানিকটা কম। শাড়ি কাপড়ের বড় দোকানগুলোর বেশিরভাগ ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ। ব্যাংক ঋণ নিয়ে তারা ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন।

করোনা ভয়াবহ আকার ধারণ করায় সরকার ১৭ মার্চ থেকে সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। আর ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ করে দেয় নিত্য প্রয়োজনীয় বাদে সব ধরনের দোকানপাট। প্রায় এক মাস ধরে শাড়ি কাপড়ের দোকান বন্ধ থাকায় পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হতে বসেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে দোকান বন্ধ থাকায় হাওয়া-বাতাস ঢুকতে পারছে না। আর এ কারণে শাড়ি কাপড়ের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে রঙের গন্ধ বের হওয়া শুরু হয়েছে। আর কিছুদিন এ অবস্থায় থাকলে এসব শাড়ি কাপড় বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়বে বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ী। এ কারণে দু’ শতাধিক ব্যবসায়ী দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে কাপুড়িয়াপট্টির ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। এটি বাজারের একেবারেই কেন্দ্রস্থলে হওয়ার কারণে এখানকার ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানের ভিতরের অবস্থাও দেখতে পারছেন না।

শাড়ি কাপড় ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগামী ৫ মে থেকে ঈদ পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১২ টা হতে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত যদি দোকান খোলা রাখা যায় তাহলে তারা যতটা পারেন পুঁজি রক্ষার চেষ্টা করতে পারবেন। একইসাথে শ’শ’ কর্মচারীর পরিবারেও চুলো জ্বলবে। তা না হলে কোনোভাবেই তারা পুঁজি রক্ষা করতে পারবেন না। ব্যাংক ঋণ থাকার কারণে পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে পড়বেন।

ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন, গত মার্চ মাসের কর্মচারীদের বেতন বহুকষ্টে পরিশোধ করেছেন তারা। সামনের দিনগুলোতে তারা কীভাবে চলবেন, কর্মচারীদের বেতন দিবেন কী করে তা নিয়ে চোখেমুখে হতাশা দেখছেন। ইতোমধ্যে অনেক ব্যবসায়ীর শাড়ি কাপড় ‘ওয়স্টেজ’ হয়েছে। যা কোনোভাবেই বিক্রি করা যাবে না।

হতাশাগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে আগামী ৫ মে থেকে ঈদ পর্যন্ত শাড়ি কাপড়ের দোকানগুলো খোলার অনুমতি চেয়েছেন জেলা প্রশাসনের কাছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, খোলার অনুমতি পেলে তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কেনাবেচা করবেন। যাতে করে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি না থাকে। এসব বিষয়ে যশোর শাড়ি কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মনসা বস্ত্রালয়ের স্বত্ত্বাধিকারী তন্ময় সাহা বলেন,‘প্রতি বছর শবেবরাত থেকে ঈদের বাজার শুরু হয়। সে মোতাবেক ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার পণ্য তোলেন দোকানগুলোতে। কিন্তু করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দোকানগুলো বন্ধ। আর এ কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দামিদামি শাড়ি। অনেকের ব্যাংক ঋণ রয়েছে। এখনই দোকানগুলো খোলা না গেলে অধিকাংশ ব্যবসায়ী পথে বসবেন। এ কারণে বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে প্রশাসন খোলার অনুমতি দিলে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবেন ব্যবসায়ীরা।’

সাধারণ সম্পাদক বন্ধনের মালিক আবুল হাসান মোল্লা বলেন,‘মালিকদের পাশাপাশি কর্মচারীদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে। দোকান খুলতে না পারলে কর্মচারী ধরে রাখা যাবে না। তখন বেকায়দায় পড়তে ব্যবসায়ীদের। একইভাবে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। আর এ অবস্থার সৃষ্টি হলে সবকিছু ফেলে পালানো ছাড়া উপায় থাকবে না। এসব কারণ বিবেচনা করে প্রশাসনকে বাস্তব সিদ্ধান্ত দিতে হবে।

Facebook Comments