মায়ের কবরই হলো, তাঁর শেষ ঠিকানা

মা আশরাফা খাতুন, ২০১৪ সালের রমজান মাসে মারা যান। তাঁকে সমাহিত করা হয় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে। মায়ের মৃত্যুর ছয় বছরের মাথায়, আরেক রমজান মাসে মারা গেলেন ছেলে বাংলাদেশের বরেণ্য সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমান। মায়ের কবরই হলো, তাঁর শেষ ঠিকানা। আজাদের ইচ্ছানুযায়ী মায়ের কবরে সমাহিত করা হয়েছে তাঁকে। আজিমপুরে দাফনপ্রক্রিয়া শেষে বাসায় ফেরার পথে জানালেন বরেণ্য এই সংগীতজ্ঞের স্ত্রী ও সংগীতশিল্পী সেলিনা আজাদ।

সেলিনা আজাদ জানালেন, হাসপাতালের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে গ্রিনরোডের বাড়ির সামনে জানাজা শেষে আজিমপুর নিয়ে যাওয়া হয়। রাত সাড়ে নয়টায় তাঁকে মায়ের কবরে সমাহিত করা হয়।

বরেণ্য সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমান শনিবার রাজধানী শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’, ‘মনেরও রঙে রাঙাব’, ‘ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়’, ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি’সহ বহু গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন আজাদ রহমান। কোনোটির সুরকার তিনি, কোনোটির সংগীত পরিচালক।

আজাদ রহমানের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে যান সংগীতশিল্পী খুরশিদ আলম। সেখান থেকেই তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জীবনে তিনি যদি এক শ ছবির গানের সংগীত পরিচালনা করে থাকেন তাহলে ৯৬ ছবিতে আমি গান গেয়েছি। তিনি আমাকে কখনো ছেলে, কখনো ভাই বলতেন—তিনি আমার সত্যিকারের অভিভাবক। আমার মনে হয়েছে, আমি এতিম হয়ে গেছি।’

আজাদ রহমান পরিচালিত বেশির ভাগ ছবির গানে কণ্ঠ দিয়েছেন খুরশিদ আলম। বরেণ্য এই সংগীত পরিচালকের সুর ও সংগীতে অসংখ্য গান গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমীনও। ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’ এবং ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’ সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেশবরেণ্য এই শিল্পী বলেন, ‘কলকাতা থেকে এসে আজাদ ভাই রেডিওতে কাজ শুরু করলেন। অনেকের সঙ্গে কাজ করলেও তাঁর কাজগুলো একেবারে অন্য রকম মনে হচ্ছিল, একদমই অন্য রকম। আমার বড় বোনসহ ফেরদৌসী রহমান আপারা যে ধরনের গান গাইতেন, তার চেয়ে একদমই আলাদা। একটা নিজস্বতা আছে। ক্ল্যাসিক্যালে যে তিনি পারদর্শী, তা তাঁর গান শুনে বোঝা যায়। তখন যে ধরনের গান চলত, তিনি মোটেও সে রকম গান বানাতেন না।’

রাজ্জাক পরিচালিত প্রথম ছবি ‘অনন্ত প্রেম’-এ ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’ গানটি ব্যবহৃত হয়। খুরশিদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে আজাদ রহমানের সুর করা এই গানের কথা লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীত পরিচালক আজাদ রহমান ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেয়ালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কলকাতার জনপ্রিয় বাংলা ছবি ‘মিস প্রিয়ংবদা’র সংগীত পরিচালনা দিয়ে চলচ্চিত্রের গানে তাঁর পথচলা শুরু। এই ছবিতে তাঁর পরিচালনায় গান গেয়েছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরতি মুখোপাধ্যায়। বাংলাদেশে তিনি প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ ছবিতে। এরপর ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘এপার ওপার’, ‘পাগলা রাজা’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘আমার সংসার’, ‘মায়ার সংসার’, ‘দস্যু বনহুর’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘মাসুদ রানা’সহ বহু ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি।

বাংলা একাডেমি থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে আজাদ রহমানের লেখা সংগীতবিষয়ক বই ‘বাংলা খেয়াল’। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘গোপন কথা’ নামের একটি সিনেমা।

Spread the love

Facebook Comments