বেতন হবে তো ঠিক ঠাক?

হালিমা বেগম থাকেন ঢাকার তেজগাঁও এলাকায়। গৃহপরিচারিকার কাজ করেন নিকেতনের দুটি বাসায়। প্রায় এক মাস ধরে তার কাজ বন্ধ। নিকেতন সোসাইটির নির্দেশে পুরো এলাকার সব বাড়িতে কাজের লোক প্রবেশ বন্ধ। তাই কাজ নেই। এপ্রিলের বেতন নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি।

হালিমা জানান, মার্চ মাসের বেতন তাকে একটি বিকাশ নাম্বারে পাঠিয়েছে যে বাসায় তিনি কাজ করেন তার মালিক। কিন্তু এপ্রিলে তিনি কাজে যেতে পারেননি। তাই এপ্রিলের বেতন নিয়ে তিনি অনিশ্চিয়তায় আছেন।

এমন অনিশ্চয়তায় আছেন কর্মজীবী মানুষদের বিশাল একটি অংশ। এর থেকে বাদ নেই গণমাধ্যমে কর্মরতরাও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক জানান, লক ডাউন শুরুর পর তাদের অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। সবাইকে বলা হয়, বাসায় থেকে কাজ করতে। সবাই তাই করছেনও। কিন্তু গত সপ্তাহে পত্রিকার প্রশাসন বিভাগ থেকে একটি মেইল আসে কর্মরত সকল সাংবাদিকের কাছে। এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এপ্রিলের বেতনের ৫০ শতাংশ প্রদান করা হবে।

সেই সাংবাদিক বলেন, আমরা পহেলা বৈশাখের বোনাস পাইনি। ঘরে বসে পুরোটা সময় কাজ করেছি। তাহলে আমরা কেন বেতন পাবো না?

তিনি বলেন, সামনে ঈদ আসছে। ঈদের বোনাস যদি না পাই তাহলে ঈদ করব কিভাবে?

একটি প্রথিতযশা দৈনিকে কাজ করেন এমন একজন জানান, তাদের অফিসেও প্রশাসন থেকে মেইল এসেছে কর্মীদের কাছে। তাতে বলা হয়েছে, শুধু বেসিক বেতনটুকু দেওয়া হবে। অন্য সকল ভাতা বন্ধ।

এভাবে করোনাকালে তীব্র অর্থনৈতিক দূর্যোগে পড়ছেন সব পেশার মানুষ। সবার প্রশ্ন বেতন হবে কীনা? সামনের দিনে কি ঘটবে?

এদিকে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা পোশাক শ্রমিকরা আছেন আরও বিপাকে। তাদের মার্চ মাসেরও বেতন হয়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মাফিক শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৭ হাজার ৬২৯ কারখানার মধ্যে ৫ হাজার ৬২৫টি শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করেছে। বাকি ২ হাজার ৩৬টি কারখানা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মজুরি দেয়নি।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ দাবি করেছে, তাদের সংগঠনের সরাসরি রপ্তানিকারক ২ হাজার ২৭৪টি কারখানার মধ্যে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মজুরি দিয়েছে ৭২ শতাংশ বা ১ হাজার ৬৬৫টি কারখানা। তাতে ২৪ লাখ ৭২ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ৮৭ শতাংশ বা ২১ লাখ ৫৯ হাজার মজুরি পেয়েছে বলে দাবি করছে তারা। অন্যদিকে বিকেএমইএ দাবি করেছে, তাদের সচল কারখানা ৮৩৩টি। তার মধ্যে গতকাল ৫১৩ কারখানার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কারখানাগুলোর মধ্যে ৪৭৭টি মজুরি পরিশোধ করেছে।

এদিকে শ্রমিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে করোনার আতঙ্ক আর অন্যদিকে মজুরির অর্থ না পাওয়ার আতঙ্কে শ্রমিকেরা হিমশিম খাচ্ছেন। আজকের বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব সরকার, মালিক ও ক্রেতাদের। তাদের মত, মালিকপক্ষ যদি মজুরি দিতে না পারে, তাহলে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বিপদে জরুরি নিরাপত্তা তহবিল গঠনের জন্য মালিক ও বিদেশি ক্রেতাদের চাপ দিতে হবে।

তাই সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক অনেক। সব পেশার মানুষকে ঘিরে ধরেছে অনিশ্চয়তা। করোনা বিস্তারের সঙ্গে এভাবে সমান্তরালে চলছে অর্থনৈতিক দূর্গতি। এখনই এ নিয়ে সক্রিয় না হলে অদূরে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে দেশের জন্য।

হাসান শাওন
লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]

Spread the love

Facebook Comments