পুঁজিবাজারে সূচকে ইতিবাচক প্রবণতা

সপ্তাহিক ব্যবধানে দেশের উভয় পুঁজিবাজারে সূচকে ইতিবাচক প্রবণতা বিরাজ করেছে। সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার কার্যদিবসেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল সূচক। ফলশ্রুতিতে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সবকটি মূল্য সূচক ও লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। একই সঙ্গে দেড় হাজার কোটি টাকার ওপরে বাজার মূলধন ফিরে পেয়েছে ডিএসই। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দু-একদিন বাজার ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। এতে বোঝা যাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা ফের বাজারমুখী হচ্ছেন। অর্থাৎ তাদের আস্থা কিছুটা ফিরেছে। বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ও অর্থমন্ত্রী বেশকিছু আশ্বাস দিয়েছেন। আসলে বাজার এ আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না। বাজার ভালো করার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক বিষয় বিবেচনা করা দরকার। প্রথম বিষয় হচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা যখন দেখবে একটি কোম্পানি ভালো পারফরম্যান্স করছে এবং সূচক বাড়ছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো ভালো লভ্যাংশ দিচ্ছে। তৃতীয়টি হচ্ছে, ম্যাক্রো অর্থনীতি ভালো আছে। চতুর্থটি হচ্ছে, মানি মার্কেট ও ক্যাপিটাল মার্কেটের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শেয়ার কেনার আগে একজন বিনিয়োগকারীর মধ্যে এ বিষয়গুলো কাজ করে। অনেকদিন ধরে মানি মার্কেটে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিভিন্নভাবে ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে ফেলে এখন ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করা হয়েছে। এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে এবং বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে, বাজারের এ রকম অবস্থার মূল কারণ হচ্ছে বিএসইসির সক্রিয়তার অভাব। যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে এবং চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে সঠিক নিয়মে বাজার উঠা-নামা করে। সেক্ষেত্রে বাজার স্থিতিশীলতা ফিরে পাবে বলেও মনে করছেন তারা।

কেউ কেউ বলছেন, পুঁজিবাজারের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী জানে না কীভাবে কারসাজি হচ্ছে। কারণ তারা অতি সহজ-সরল বিনিয়োগকারী। তারা মনে করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করলে বাজার ভালো হয়ে যাবে। আসলে বিষয়টি তা নয়। বাজার ভালো করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএসইসি অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এটাই সবাই চায়। কিন্তু এখন বাজারের দুরবস্থায় তাতে বাজারকে স্থিতিশীল অবস্থানে নেওয়ার মতো সক্ষমতা না আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের, না আছে বিএসইসির। বাজারে বিরাজমান সমস্যাগুলোর বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে এবং বিষয়গুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি যেতে হবে।

এদিকে, সাপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৬ পয়েন্ট বা ০.৭১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৬৯ পয়েন্টে। অপর সূচকগুলোর মধ্যে শরিয়া সূচক ১৮ পয়েন্ট বা ১.৫৭ শতাংশ এবং ডিএসই-৩০ সূচক ২ পয়েন্ট বা ০.১৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ১৯২ এবং ১ হাজার ৮৩৮ পয়েন্টে। আর বিদায়ী সপ্তাহে ৩৫৪টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ১৮২টির বা ৫১ শতাংশের, কমেছে ১৫৪টির বা ৪৪ শতাংশের এবং ১৮টির বা ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দর অপরিবর্তিত রয়েছে। এগুলোর ওপর ভর করে ২ হাজার ২০২ কোটি ২৩ লাখ ৯ হাজার ৪৫৫ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের সপ্তাহ থেকে ২০৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৪ হাজার ৯২৪ টাকা বা ১০.২০ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল১ হাজার ৯৯৮ কোটি ৪২ লাখ ২৪ হাজার ৫৩১ টাকার।

আলোচ্য সময়ে ডিএসইর মোট লেনদেনে ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারের দখলে ছিল ৮১ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ ‘এ’ ক্যাটাগরিতে শেয়ারের লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৭৮৮ কোটি ৩১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৫ টাকার। ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ারের অংশগ্রহণ ছিল ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এসব শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২৭৪ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। আর ডিএসইর মোট লেনদেনে ‘এন’ ক্যাটাগরির অংশগ্রহণ ছিল ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এসব শেয়ারের লেনদেন হয়েছে ১১৯ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ‘জেড’ ক্যাটাগরির দখলে ছিল দশমিক ৮৯ শতাংশ। এসব শেয়ারের লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এছাড়া সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়েছে ১ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, সপ্তাহশেষে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৮৫ পয়েন্ট বা ০.৫৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৭৯৮ পয়েন্টে। এছাড়া সিএসসিএক্স ৫৩ পয়েন্ট বা ০.৫৫ শতাংশ, সিএসই-৩০ সূচক ২৭ পয়েন্ট বা ০.১৯ শতাংশ, সিএসই-৫০ সূচক ৫ পয়েন্ট বা ০.৪২ শতাংশ এবং সিএসআই ১৭ বা ১.৬৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৯ হাজার ৬০৪, ১৩ হাজার ৮৭০, ১ হাজার ১৬৫ ও ১ হাজার ৩৫ পয়েন্টে। বিদায়ী সপ্তাহে সিএসইতে মোট ৩১৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের হাত বদল হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৬৫টির, দর কমেছে ১৪১টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ২১টির। এগুলোর ওপর ভর করে সপ্তাহজুড়ে ৯৫ কোটি ৭৪ লাখ ৫১ হাজার ৫১৭ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল ৯৬ কোটি ১৮ লাখ ২৬ হাজার ৫৩১ টাকার। এ হিসাবে সপ্তাহের ব্যবধানে সিএসইতে টাকার পরিমাণে লেনদেন ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার ১৪ টাকা বা ০.৪৫ শতাশ কমেছে।

Facebook Comments