ঢাকায় কভিড আক্রান্তের ৭৮ শতাংশের লক্ষণ উপসর্গ নেই : জরিপ

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় দেশের দুটি প্রতিষ্ঠানের করা এক খানাজরিপের আংশিক ফলাফল বলছে, এখানে কভিড আক্রান্তের প্রায় ৮০ শতাংশই উপসর্গহীন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর’বি) যৌথভাবে এই জরিপটি চালিয়েছে।

জরিপের প্রকাশিত আংশিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ঢাকায় কভিড আক্রান্তের ৭৮ শতাংশই কোনো লক্ষণ উপসর্গ ছাড়া আছেন।

তবে প্রায় দেড় কোটি জনসংখ্যার এই দুই সিটি করপোরেশনের মাত্র ১২ হাজারের কিছু বেশি মানুষের ওপর চালানো জরিপের এই ফলাফলকে এতোটা সরলীকরণ করে বলতে চাইছে না সরকারি প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর।

সরকারি হিসাবে, এখন পর্যন্ত দেশে কোভিড ১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২ লাখ ৬৩ হাজার। তবে গত ১৮ এপ্রিল থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত আইইডিসিআর ও আইসিডিআরবি’র যৌথ জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, আক্রান্তের হার নিশ্চিতভাবে অনেক বেশি। গত ১৮ এপ্রিল থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত জরিপ করে এ দুটি প্রতিষ্ঠান। এতে সহযোগিতা করে ইউএসএআইডি এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।

জরিপে পরিবারগুলোকে পরীক্ষার মাধ্যমে লক্ষ্মণ বা উপসর্গযুক্ত এবং উপসর্গহীন— এ দুভাবে ভাগ করা হয়েছে। জরিপের দিন বা আগের সাত দিনের মধ্যে কোনো পরিবারের কোনো সদস্যের মধ্যে যদি কভিড-১৯–এর সাধারণ চারটি উপসর্গের একটি চিহ্নিত হয়, তবে সেই পরিবারকে ‘লক্ষণযুক্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর জরিপের দিন বা এর আগের সাত দিনের মধ্যে যদি কোনো পরিবারের কোনো সদস্যের মধ্যে কভিড-১৯–এর কেনো লক্ষ্মণ না পাওয়া গেলে সেই পরিবারকে লক্ষ্মণ বা উপসর্গহীন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপসর্গযুক্ত ও উপসর্গহীন উভয় পরিবারের সদস্যদের পরীক্ষা করা হয়েছে।

দুই সিটির ৩ হাজার অধিক পরিবারের ওপর এ জরিপ চলে। এর মধ্যে ২১১ জন লক্ষ্মণযুক্ত ব্যক্তি পাওয়া যায়। এসব লক্ষ্মণযুক্ত পরিবারের মধ্যে থেকে ৪৩৫ জন উপসর্গহীন ব্যক্তি শনাক্ত হন। এর মধ্যে ২০১ জনের পরীক্ষা করা হয়। আর উপসর্গহীন পরিবারের মধ্যে থেকে ৮২৭ জন উপসর্গহীন ব্যক্তি শনাক্ত হন। তাঁদের মধ্যে থেকে ৫৩৮ জনের পরীক্ষা করা হয়। এ জরিপে ঢাকার ছয়টি বস্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে মোট পরিবারের সংখ্যা ছিল ৭২০টি।

জরিপে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪০–ঊর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পজিটিভ ব্যক্তি শনাক্ত হয়। এ সংখ্যা ছিল ১৩ শতাংশ। আর ১৫ থেকে ১৯ বয়সী মধ্যে কভিড-১৯–এর উপস্থিতি দেখা গেছে ১২ শতাংশ। ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৮ শতাংশের মধ্যে কোভিড-১৯–এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিদের ৫৩ শতাংশের মধ্যে জ্বর দেখা গেছে। ৩৬ শতাংশের মধ্যে সর্দি-কাশি দেখা গেছে, ১৭ শতাংশের মধ্যে গলাব্যথা দেখা গেছে। আর মাত্র ৫ শতাংশের মধ্যে পরীক্ষার দিন শ্বাসকষ্টের লক্ষ্মণ দেখা গেছে। উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৫ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে মাত্র একজনের মৃত্যু হয়েছে। উপসর্গযুক্ত মৃত ব্যক্তি হাসপাতালে গিয়ে মারা যান।

রাজধানীর বাসিন্দাদের ৯ শতাংশই কোভিড আক্রান্ত। অথচ তাদের ৭৮ ভাগের দেহে নেই কোনো লক্ষ্মণ-উপসর্গ। যা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও পরীক্ষার হার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাই তুলে ধরছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে জরিপের আংশিক এই ফলাফলকে ঢালাওভাবে উপস্থাপন না করে বরং মোট আক্রান্ত ৯ শতাংশের কাছাকাছি এমন বলতে চান আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর।

তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা এখনো তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করছি। প্রাথমিকভাবে ফলাফলে যেটা উঠে এসেছে এটা একটা ধারণা মাত্র। আক্রান্তের হারে খুব একটা কমবেশি না হলেও উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যা এতোটা হবে না বলে মনে করেন তিনি।

প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মনে করেন, উপসর্গহীন ব্যক্তি অনেকে আছে এটা ঠিক। তবে তারা সেরেও উঠছেন অনেকে। আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আগামী সপ্তাহ নাগাদ পুরো প্রতিবেদনের তথ্য জুমের মাধ্যমে সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানাবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপসর্গহীন থাকার বিষয়টি আগেও বলেছেন অনেক জনস্বাস্থ্যবিদ। বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে তখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ নানা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন তারা।

উল্লেখ্য, ঢাকার যেখানে সামগ্রিক জনসংখ্যার ৯ শতাংশের মধ্যে কভিড-১৯ দেখা গেছে, সেখানে বস্তিবাসীর মধ্যে এর উপস্থিতি ৬ শতাংশ।

Spread the love

Facebook Comments