জামদানির আসল-নকল চিনবেন যেভাবে

আভিজাত্য ও রুচিশীলতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয় জামদানিকে। তাই যেসব নারীরা শাড়ি পছন্দ করেন, তাদের সংগ্রহে অন্তত একটি হলেও জামদানি শাড়ি রয়েছে। নকশা ও বুননের কারণে ইউনেস্কো থেকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিও অর্জন করেছে এই জামদানি।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে আজকাল বিভিন্ন মার্কেটে জামদানির নামে বিক্রি হচ্ছে নকল শাড়ি। জামদানি বলে ভারতীয় কটন, টাঙ্গাইলের তাঁত, পাবনা ও রাজশাহীর সিল্ক শাড়ি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে ঐতিহ্যবাহী জামদানির আবেদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্রেতারা।

তাহলে কিভাবে আসল জামদানি সংগ্রহ করবেন রমনীরা?

এক্ষেত্রে তাঁত বিশেষজ্ঞরা বলেন, শাড়ি কেনার আগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে। সেগুলো হলো শাড়ির দাম, সূতার মান এবং কাজের সূক্ষ্মতা। একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে দুইজন কারিগর যদি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দেন, তাহলে ডিজাইন ভেদে পুরো শাড়ি তৈরি হতে সাত দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগে।

সাধারণত শাড়ি তৈরির সময়, সূতার মান ও কাজের সূক্ষ্মতা বিবেচনায় একটি জামদানির দাম ৩ হাজার টাকা থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা কিংবা তারচেয়েও বেশি হতে পারে। কিন্তু মেশিনে বোনা শাড়িতে তেমন সময় বা শ্রম দিতে হয় না। এজন্য দামও তুলনামূলক অনেক কম।

এবার জেনে নিন আসল জামদানি শাড়ি চেনার উপায়-

* জামদানি শাড়ি হাতে বোনা হওয়ায় শাড়ির ডিজাইন হয় খুব সূক্ষ্ম এবং নিখুঁত। ডিজাইনগুলো হয় মসৃণ।

* কারিগর প্রতিটি সূতা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুনন করেন। সূতার কোন অংশ বের হয়ে থাকে না। এ কারণে জামদানি শাড়ির কোনটা সামনের অংশ আর কোনটা ভেতরের অংশ তা পার্থক্য করা বেশ কঠিন।

* মেশিনে বোনা শাড়িতে কেবল জামদানির অনুকরণে হুবহু নকশা সেঁটে দেয়া হয়। এই শাড়িগুলোর উল্টো পিঠের সূতাগুলো কাটা কাটা অবস্থায় বের হয়ে থাকে।

* জামদানি শাড়ি চেনার আরেকটি উপায় হতে পারে এর সূতা ও মসৃণতা যাচাই করা। জামদানি শাড়ি বয়নে সুতি ও সিল্ক সূতা ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

* সূতার ব্যবহারের দিক থেকে জামদানি সাধারণ তিন ধরনের হয়ে থাকে। ফুল কটন জামদানি- যেটা তুলার সূতা দিয়ে তৈরি করা হয়। হাফ-সিল্ক জামদানি- যেখানে আড়াআড়ি সূতাগুলো হয় রেশমের, আর লম্বালম্বি সূতাগুলো হয় তুলার। ফুলসিল্ক জামদানি- যেখানে দুই প্রান্তের সূতাই রেশমের হয়ে থাকে।

* তাই শাড়ি কেনার আগে এই সূতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সূতার মান যাচাই করতে শাড়ির আঁচলের শেষ প্রান্তে যে সূতা বের হয়ে থাকে সেগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে।

* নাইলনের সূতা মসৃণ হয় আর জামদানির সিল্ক সূতায় মাড় দেয়া থাকায় সেটা হবে অপেক্ষাকৃত অমসৃণ। সাধারণত পিওর সিল্কের সূতা টানাটানি করলে ছিঁড়ে যায় এবং এই সূতা আগুনে পোড়ালে চুলের মতো পোড়া গন্ধ বেরোয়।

* আঁচলের শেষ প্রান্তের সূতাগুলো আঙ্গুল দিয়ে মোড়ানোর পর যদি সূতাগুলো জড়িয়ে যায়, তবে সেটা সিল্ক সূতার তৈরি, আর যদি সূতাগুলো যেকোনো অবস্থায় সমান থাকে তবে তা নাইলন।

* এছাড়া কাউন্ট দিয়ে সূতার মান বোঝানো হয়। যে সুতার কাউন্ট যত বেশি, সেই সুতা তত চিকন। আর সূতা যতো চিকন, কাজ ততই সূক্ষ্ম হবে- যা ভাল মানের জামদানি শাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য। জামদানি শাড়ির সূতাগুলো সাধারণত ৩২-২৫০ কাউন্টের হয়ে থাকে।

* জামদানির মান মূলত কাজের এই সূক্ষ্মতার উপর নির্ভর করে। আর শাড়ি কতোটা সূক্ষ্ম হবে, তা নির্ভর করে এই সূতা এবং তাঁতির দক্ষতার উপর। সাধারণত যে শাড়িটার কাজ যতো সূক্ষ্ম স্বাভাবিকভাবেই তার দামও ততো বেশি হয়ে থাকে। আবার সূতা যত চিকন সেই শাড়ি বুনতেও সময় লাগে তত বেশি, কাজেই দামও বেশি পড়ে।

* জামদানি শাড়িতে যে অংশটুকু কোমরে গুঁজে রাখা হয়, ওই অংশটায় অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ হাত পর্যন্ত কোন পাড় বোনা থাকে না। কিন্তু মেশিনে বোনা শাড়ির পুরো অংশ জুড়েই পাড় থাকে।

* হাতে বোনা জামদানি ওজনে হালকা হয়ে থাকে এবং পরতেও আরামদায়ক। তবে জামদানি খুব যত্ন করে রাখতে হয়, না হলে বেশিদিন টেকসই হয় না।

* মেশিনে বোনা শাড়ি কৃত্রিম সুতায় তৈরি হয় বলে এই শাড়িগুলো হয় ভারি এবং খসখসে। তবে এই শাড়িগুলো বছর বছর ধরে পরা যায়।

* জামদানির প্রধান বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক নকশা। এই জ্যামিতিক নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয় নানা ধরনের ফুল, লতাপাতা, কলকাসহ নানা ডিজাইন। তারমধ্যে পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খী, বটপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, দুবলি, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার, কলকাপাড় ইত্যাদি বেশি প্রচলিত।

সূত্র : বিবিসি

Facebook Comments