জাদুকরি ফসল পাট

জাদুকরি ফসল পাট। এক হেক্টর জমির পাট প্রতিদিন প্রকৃতি থেকে ১৫ টন কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং ১১ টন অক্সিজেন নিঃসরণ করে! যদি সারা পৃথিবীব্যাপী বাণিজ্যিকভাবে পাট উৎপাদন শুরু হয়, তাহলে পাট একাই গ্লোবাল ওয়ার্মিং সমস্যার সমাধান করতে পারবে! কথাটি অদ্ভুত শোনালেও এটাই বাস্তব। আগ্রহীদের জন্য ধারাবাহিক কয়েক পর্ব আকারে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

আপনারা জানেন, ড. মোবারক আহমেদ খানের পাট থেকে পলিথিন তৈরী পৃথিবীর জন্য একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। কিন্তু ৩ বছর হতে চলল, এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের এখনো কমার্শিয়ালাইজেশন বা বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়নি। কারণ এটি একজন হতভাগ্য বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর আবিষ্কার! যদি অন্য কোনো দেশ আবিষ্কার করত, তবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে সেই প্রযুক্তি আমদানী করতেন এবং মহাসমারহে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়ে যেত।
অন্যদিকে সরকারের এই বিষয়ে খুব একটা গরজ আছে বলে মনে হয় না। কারণ সরকার পক্ষের অনেকেই চান বিরাট অংকের বাজেট দেখিয়ে, সরকারি কোষাগার থেকে বিরাট বাজেট খসিয়ে, বিরাট বিরাট আয়োজন করে, বিরাট অংকের টাকা ভাগাভাগি করে খেতে। যার সম্পূর্ণ দায়ভার বিজ্ঞানীকে বহন করতে হবে। এই অবুঝ লোকগুলো কেন বোঝেন না যে, গবেষণাগারে হাজার বিনিদ্র রজনী পার করা একজন বিদগ্ধ বিজ্ঞানীকে দিয়ে আর যাই হোক পুকুর চুরির কাজে ব্যবহার করাটা অমানবিক। অপরদিকে, তথাকথিত কর্পোরেটরাও কম যান না! তেনারা চান, “স্যার আইপি বা ফর্মূলাটা দিয়ে দেন, ইনকাম যা হবে আপনার পার্সেন্টেজ পৌঁছে দেয়া হবে”! বিদেশি কোম্পানিরা বলে, “ড. খান, তুমি আইপি ভ্যালু যত টাকা চাও তোমাকে দেয়া হবে। কিন্তু কমার্শিয়ালাইজেশন বাংলাদেশে হবে না, এই দেশ থেকে পাট কিনে নিয়ে গিয়ে আমরা আমাদের দেশে পন্য উৎপাদন করবো”! বিজ্ঞানীর পরিষ্কার জবাব, “না আমি তোমাদের পুকুর চুরিতে অংশ নেব, না তোমাদেরকে আমার আবিষ্কারকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেব, না নীল চাষীদের প্রশ্রয় দেব। এই আবিষ্কারে বাংলাদেশিদের সম্পূর্ণ হক আছে। বাংলার অবহেলিত পাট চাষীদের জীবন পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসবে এই আবিষ্কার। তাই আমি নিজ হাতে এই আবিষ্কারের কমার্শিয়ালাইজেশন করতে চাই, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের বায়ো সাইন্স গবেষণাগার নির্মাণ করতে চাই”।

এখানে উল্লেখ্য যে, অতীতে বাংলাদেশে পূর্ববর্তি অনেক বিজ্ঞানীকে গবেষণাগার নির্মাণের মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে এবং যথারীতি আশ্বাস দিয়েও তাঁদেরকে আন্তর্জাতিক মানের কোনো গবেষণাগার তৈরি করে দেয়া হয়নি। আবিষ্কারগুলো কখনও বেহাত হয়েছে, কখনও অবহেলায় পড়ে রয়েছে। সুতরাং ডঃ মোবারক চান পাট থেকে পলিথিন প্রকল্প কার্যকর করতে হলে একটি ওয়ার্ল্ডক্লাস গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করতেই হবে!

কিন্তু, প্রত্যেক লগ্নিকারকরা এই গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন গবেষণাগারে লগ্নি করা মানে অনুউৎপাদনশীল খাতে অর্থ লগ্নি করা। যার কোনো রিটার্ন নেই। উহারা বোঝেন না যে ইহাই সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট! আমার মনে হয় উহারা আজীবন বিদেশী প্রযুক্তি ও কাঁচামাল আমদানি করা, দেশের শ্রমিক খাটিয়ে পণ্য উৎপাদন করা, অতঃপর রপ্তানি করা, এই ছকেই চলতে অভ্যস্ত। সরকার, ব্যাংক, বীমা, দাতা, উৎপাদনকারী, বাজার ব্যবস্থা সবাই একই ছকে বাঁধা। ফলে নিজেদের দেশের আবিষ্কার, নিজেদের প্রযুক্তি, কৃষক, কাচমাল, সাপ্লাই চেইন, উৎপাদন, বাজার সম্প্রসারণ ইত্যাদি নানান বিষয়ে নতুন করে সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে তাদের অনাগ্রহ। অথচ, শুধু উদ্ভাবনী আইডিয়া ও ইনফরমেশন টেকনোলজি দিয়েই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করা যায়। বিশ্ব বাজারে পরিবেশ বান্ধব পাট পণ্যের বিশাল বাজার সৃষ্টি করা যায়। ইনফ্যাক্ট বিশাল বাজার সৃষ্টি হয়ে আছে, শুধু ঠিকঠাক মত প্রবেশের অপেক্ষা মাত্র। এই বিষয়ে পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা যেতে পারে।
এখন, চলুন দেখি পাট থেকে পলিথিন পণ্যের কমার্শিয়ালাইজেশনের সাথে সাথে কেন এই গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি…

১. পাট থেকে আরো অনেক পণ্য তৈরি ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের রাস্তা সুগম করা।
২. পরিবেশ বান্ধব পণ্য উৎপাদনের পর বাজার থেকে বাউন্স ব্যাক হওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা ও সমাধান করা।
৩. নবীন ও তরুণ বিজ্ঞানীদের পরিবেশ বান্ধব পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত ও গবেষণায় সর্বপ্রকার সহযোগিতা করা।
৪. বাংলাদেশে বিশ্বের বিভিন্ন বায়ো সাইন্স বিজ্ঞানীদের একত্রিত করা। পরিবেশ বান্ধব পণ্যের নতুন পৃথিবীর ঘোষণা দেয়া।
৫. যেকোনো পানিতে দ্রুততম সময়ে পাট পচন পদ্ধতির আধুনিক উপায় বের করা।
৬. পাটকে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
৭. পাট উৎপাদন সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দেয়া। যাতে সবাই ঘরের ছাদে বা উঠানে পাট উৎপাদন করতে পারে। পাটের বাজার মূল্য যেন এমন হয় যে, এক ব্যাগ কাঁচা পাট মানেই এক সপ্তাহের ঘরের বাজার।
৮. পরিবেশ বান্ধব পণ্য উৎপাদনে টেকসই প্রযুক্তি প্রণয়ন ও স্থানীয় প্রকৌশল শিল্পের উন্নয়ন।
৯। পরিবেশ বান্ধব পণ্য উৎপাদনে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার।
১০। ইত্যাদি আরো অনেক কিছু ।

আগামী পর্বে মোবারক স্যারের পাট থেকে পলিথিন পণ্য উৎপাদন বা কমার্শিয়ালাইজেশনের মূল চ্যালেন্জগুলো কী কী এবং সেই চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে স্থানীয়ভাবে মোকাবেলা করা যায় তা নিয়ে অল্প বিস্তর আলোচনা করা হবে।

লেখক: নোমান রবিন | ব্যবস্থাপনা পরিচালক | অশেষ| www.oshesh.org | [email protected]

Facebook Comments