গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পাট চাষী

প্রকৃতিতে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপি গাছ রোপন নিয়ে নিরলস প্রচেষ্টা বিপুল প্রশংসার দাবি রাখে। এক পাহাড় পরিমাণ গাছ বেড়ে ওঠার উচ্চতা অনুযায়ী ১৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে প্রকৃতিতে যেই পরিমাণ অক্সিজেন প্রদান করবে। ১৫ বছরে ৩০ ফসল উৎপাদনের মধ্য দিয়ে মাত্র কয়েক হেক্টর জমিতে পাট এর বহুগুণ অক্সিজেন প্রদান করবে। যদিও গাছ রোপণ মাটির অবস্থান ও অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

তৃতীয় পর্ব
২। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে পাট চাষে সৃষ্ট সমস্যা ও তার সমাধান : এই প্রকল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পাট চাষী। তারা সহজ সরল জীবন যাপন করেন, তথ্যপ্রযুক্তি বান্ধব নন। তারা এই প্রকল্পটির গেম চেঞ্জার। তাই কৃষকের জব ডেসক্রিপশন ও চ্যালেঞ্জ বেবিবেচনায় নিয়ে পুরো প্রকল্পকে সাজাতে হবে। যেমন, পাট গাছ কাটার যোগ্য হয় চারা রোপনের ৯০ দিন থেকে ১০০ দিনের মধ্যে। পাট কাঠি থেকে কাঁচা ছাল ছাড়াতে সময় লাগে আরো ২ দিন, পানিতে পাট পঁচতে ২০-২৫ দিন। শুকাতে লাগে আরো প্রায় ৪-৫ দিন। অর্থাৎ মাটিতে পাট চারা রোপন করা থেকে শুরু করে পাকা পাট এজেন্টের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত সময় ব্যয় হবে প্রায় ১২৫ থেকে ১৩৫ দিন। অন্যদিকে বাংলাদেশের আরেক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলমের পাটের ডিএনএ তত্ত্ব বা জেনম আবিষ্কারের কারণে বছরে দুই বার পাটের ফসল ফলানো যাবে! ফলে মূল কাঁচামাল হিসেবে পাট সাপ্লাইয়ের কমতি হবে নাহ। খুব ভালো কথা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চাহিদা মোতাবেক বিপুল পরিমাণ পাট প্রসেস করতে প্রচুর পরিমাণ পানির দরকার হয়। এই পানির উৎস কী? স্থানীয় ডোবা, নালা অথবা পুকুর। পানিতে একবার পাট পঁচাতে গেলে বা পাট ধুলে পানির মান নষ্ট হবে। এই পানি গৃহস্থলির কোনো কাজেই আসে না। পাট পলিথিন কমার্শিয়ালাইজ প্রকল্প শুরু হলে পাট চাষাবাদের পরিমাণ বেড়ে যাবে, পাশপাশি বেড়ে যাবে পঁচা পানির পরিমাণও। যা গ্রাম অঞ্চলে গৃহস্থলির কাজে পানি সংকট তৈরি করবে। ইহা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ! এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপায় কী? উপায় ‘অশেষ’ এর কাছে আছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মোতাবেক আছে। এই পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে ১২৫ থেকে ১৩৫ দিনের পরিবর্তে ১০০ থেকে ১১০ দিনেই সোনালী পাট পাওয়া যাবে। চাষীর ঘাড় থেকে পাট পঁচানো ও শুকানোর বোঝাটি নিয়ে নিতে হবে।

৩। পাট ক্রয়ে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহারঃ এই প্রকল্পে বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলকে অশেষ পদ্ধতির পাট চাষাবাদের পাইলট অঞ্চল হিসেবে বাছাই করা যেতে পারে। এই অঞ্চলে সাধারণ পাট উৎপাদিত হয়, দামেও সাশ্রয়ী। অশেষ পাট কেনাবেচার কাজে শত শত স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগ করে মোবাইল ব্যাংকি সিস্টেমের মাধ্যমে, সরকার নির্ধারিত মূল্যে পাট ক্রয় করে পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করবে। প্রত্যেকটি পাট পলিথিন উৎপাদনকারীকে ‘সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার’ এর মাধ্যমে ‘বায়ো-পলিমার’ ক্রয়ের আগাম ঘোষণা দিতে হবে। বাজারের আগাম চাহিদা মোতাবেক, এজেন্টের মাধ্যমে গ্রাম থেকে পাট ক্রয় চালু রাখতে হবে। অশেষ এজেন্ট সরকার নির্ধারিত মূল্যে পাট ক্রয় করে সরাসরি নির্ধারিত ফ্যাক্টরিতে নিয়ে আসবে। সফটওয়্যার চেক করে অশেষ এজেন্টদের পাটের মূল্য পরিশোধ করা হবে।

৪। পাট থেকে বায়ো-পলিমার উৎপাদন প্রক্রিয়া (ডঃ খান ফর্মূলা): প্রকল্পের মূল চালকা শক্তি হচ্ছে ড. মোবারক আহমেদ খানের ফর্মুলা। এজেন্টের মাধ্যমে পাট নির্ধারিত ফ্যাক্টরি বা প্লান্টে পৌঁছানোর পর তা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বয়লারে কয়েক প্রক্রিয়ায় পানির সাথে মিশিয়ে, ভালোভাবে নাড়িয়ে নরম করতে হবে। এরপর সেই ভেজা, তুলনামূলক নরম পাট ড্রায়ার মেশিনে খরখরা করে শুকাতে হবে। প্রকৃতি বান্ধব ক্যামিকেল দিয়ে আবার পানির সাথে মিশিয়ে রিয়েকশন চেম্বারে রেখে দেয়া হবে। এক সময় গলিত পাট থেকে ৭০% তরল বায়ো-পলিমার এক্ট্রাক্ট বা চুষে নেয়া হবে। এটিই সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার ১০০% বায়ো ডিগ্রেডেবল পলিমার! এই লিকুইড থেকেই বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে সেলুলস কাস্টিং মেশিনের মাধ্যমে পাট পলিথিন উৎপাদিত হবে। আরো আনন্দের খবর হচ্ছে যে, পাট পলিথিনের বায়োডিগ্রেডিবিলিটি বা পানিয়ে গলে যাওয়া বা মিশে যাওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। পাট পলিথিন ১০ বছর পানিতে মিশে যাবে না ৩ মাসে মিশে যাবে, তা এই ‘বায়ো-পলিমার’ উৎপাদনের সময় ক্লাইন্টের ইচ্ছা অনুযায়ী নির্ধারণ করা যাবে। এই আবিষ্কার ও প্রক্রিয়ার স্বচিত্র প্রতিবেদন দেখতে চাইলে আমাদের নির্মিত ভিডিও ডক্যুমেন্টারি লিঙ্ক এই লেখার শেষে সংযোজন করা হলো।

বিশেষ নোট : আগেই বলেছি যে, তেলের খনি থেকে পলিমার উত্তোলনের সময় তা তরল আকারে থাকে। পরে এটিকে দানায় রূপান্তরিত করা হয়। ড. খানের ফর্মুলায় এই তরল বায়ো-পলিমাত পাওয়া যাবে, কিন্তু তরল সেলুলস থেকে দানা তৈরিতে সামান্য গবেষণার প্রয়োজন। নিজস্ব গবেষণাগার ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো ল্যাব এই সুবিধা প্রদান করবে না, আর যদি সুবিধা প্রদান করেও, তাহলে অন্যের ঘরে এমন গবেষণা না করাই ভালো। উল্লেখ্য যে, দুই টন পাট থেকে এক টন তরল উৎপাদিত হয়। এই তরল পলিমার কীভাবে প্লাস্টিক উৎপাদনকারীদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে? কীভাবে তারা তা থেকে পাট পলিথিন তৈরি করবে? তরল থেকে পাট পলিথিন তৈরিতে ব্যবহৃত বিরাট বিরাট সেলুলস কাস্টিং মেশিন কোত্থেকে আসবে? কারা সাপ্লাই করবে? ইত্যাদি নানান প্রশ্নের উত্তর পরের পর্বে।

পড়ুন
পর্ব-১
পর্ব-২

লেখা চলবে।

লেখক : নোমান রবিন । ব্যবস্থাপনা পরিচালক । অশেষ কনসালটেন্সি ও সার্ভিসেস লিঃ । www.oshesh.org | [email protected]

Spread the love

Facebook Comments