করোনা প্রতিরোধে ইনকিউবেটর মাস্ক উদ্ভাবনের দাবি প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানির

মনসুর আহমেদ সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সেখানে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে অনার্স শেষ করে মাস্টার’স করতে তিনি আসেন ইতালির মিলানে। পড়ালেখা শেষ করে ইন্টার্ন সমাপ্ত করেন। এরপর মিলানেরই একটি প্রতিষ্ঠানে প্রোডাক্ট ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগে চাকরি শুরু করেন।

মনসুর আহমেদ বলেন, আমার ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে ইতালির নানা শহর। যেমন গোছানো এদের শহরগুলো, ঠিক তেমনই সাজানো সে দেশের প্রশাসনিক, দাপ্তরিক এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো। কিন্তু এতো সুসজ্জিত একটা দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ল শুধুমাত্র কিছু ভুল আর বিলম্বিত সিদ্ধান্তের কারণে।

প্রাণ চঞ্চল, মানুষে ভরপুর, ফ্যাশন আইকন এক নগরীতে আজ শুধু অ্যাম্বুলেন্স এর সাইরেন। কখনও খুব কাছ থেকে আবার কখনও ভেসে আসে দূর থেকে।

নিজের উদ্ভাবন সম্পর্কে মনসুর বলেন, ভেন্টিলেটর এই সময়ের সবচেয়ে দরকারি যন্ত্র। কারণ এই যন্ত্র দিয়ে কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে রোগীদের জীবন বাঁচানো সম্ভব। তবে ঘাটতি আছে এই যন্ত্রের। আর এটি ব্যয়বহুল। কিন্তু প্রতিটি জীবনই অমূল্য। এমন যদি হয় একটি মাস্ক হয়ে উঠবে এক একটি ইনকিউবেটর, আর এই মাস্কগুলো বানাতে খরচ হবে ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। এই চিন্তা থেকে আমি একটি ফুলফেস মাস্ক এর মডেল দাঁড় করিয়েছি, যা হবে একটি ফুলফেস মাস্ক ও একটি ইনকিউবেটর।

এই বিশেষ ইনকিউবেটর মাস্ক সম্পর্কে মনসুর আহমেদ বলেন, ‘মাস্কটির কাঠামো থেকে শুরু করে প্রতিটি অংশ তৈরি সুলভ পলিমার দিয়ে। ফ্রেমের চারপাশে থাকবে রাবার। যা আক্রান্ত রোগীর পুরো মুখে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে। তাই এই মাস্ক পরিধানের পর ডাক্তার, নার্স এবং আশপাশের সুস্থ মানুষের সংক্রমিত হবার আশঙ্কা থাকবে না। এছাড়া এর জন্য নেই আলাদা কোনো রুমের প্রয়োজন। সাধারণ ওয়ার্ডেই করোনা আক্রান্ত রোগীদের রাখা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‌’মুখের অগ্রভাগে (নাকের অংশে) বসানো হবে বারবার ধুয়ে ব্যবহার যোগ্য পলিমারিক মেমব্রেন (ওয়ান টাইম সার্জিকাল ফিল্টার ও ব্যবহার করা সম্ভব)। বিভিন্ন আকৃতির মুখের সাথে মানিয়ে নেবার জন্য ফ্রেমের চোয়ালে আছে অ্যাডজাস্টেবল মেকানিজম। মাস্কের মাথার অংশে থাকবে একটি সকেট, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফিচার।এই সকেটে আছে দুটি চ্যানেল। একটি যুক্ত হবে অক্সিজেনের লাইনের সাথে আর অন্য চ্যানেলে থাকবে পিইপ (পজিটিভ অ্যান্ড এক্সপিরেটরি প্রেসার)। যার সাহায্যে কর্তব্যরত ডাক্তার অক্সিজেনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। ফ্রেমের অভ্যন্তরীন চ্যানেল অক্সিজেনের সুষ্ঠ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। মাস্কের ভিতরের আদ্রতা স্বাভাবিক রাখার জন্য আছে বিশেষ ব্যবস্থা।’

মনসুর আহমেদ বলেন, ‘আমি মডেলটির কিছু ছবি কয়েকজন বিশিষ্ট ডাক্তারের কাছে পাঠাই। সবাই আশা করছেন, এটি হতে পারে সত্যিকার অর্থেই একটি জীবন রক্ষাকারী ফুলফেস মাস্ক। এ কারণে সবার আগে প্রয়োজন কিছু মাস্ক তৈরি করা, যাতে করে এর পরীক্ষামূলক ফলাফল যাচাই করা যায়।’

এই মাস্কের কার্যক্ষমতা দেখার জন্য দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সহযোগীতা চেয়েছেন মনসুর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘যদিও দেশে এখন লক ডাউন পরিস্থিতি, তবুও আশা করব দেশীয় কিছু প্রতিষ্ঠান যোগাযোগের জন্য এগিয়ে আসবে এবং বৃহত্তর স্বার্থে আমরা এক সাথে কাজ করতে পারব। এখনই উৎপাদনে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজাইন এবং নির্দেশনা প্রস্তুত আছে এবং কিছু হাসপাতালও আগ্রহী এর প্রয়োগ দেখতে।’

তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি অতি দ্রুত আমরা পরীক্ষামূলক কিছু ফুলফেস মাস্ক বানিয়ে হাসপাতালগুলোকে দিতে পারবো এবং তাদের ফলাফলের ভিত্তিতে অতিসত্বর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে আমরা সারা দেশে এই মাস্ক পৌঁছে দিতে পারবো।’

Facebook Comments