করোনায় স্বাস্থ্য বুলেটিন বন্ধ, তথ্যগুমের পথে আরও এক ধাপ

দেশে কোভিড -১৯ ভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে রোজ নিয়ম করে স্বাস্থ্য বুলেটিন প্রচার হত। ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিন প্রচার করে আসছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর। পরে স্বাস্থ্য অধিদফতর এ দায়িত্ব নেয়। কোনো কোনো দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই কথা বলেছেন বুলেটিনে।

রোজ বেলা আড়াইটায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন পদস্থ কর্মকর্তা এ বুলেটিন নিয়ে হাজির হয়ে থাকেন। এতে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে দেশে মৃত্যু, আক্রান্ত ও সুস্থতার পরিসংখ্যান এবং বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এছাড়া বুলেটিনে নিয়ম করে বিভিন্ন সচেতনতামূলক বার্তা দেয়া হয়। এই মহামারীর সময় দর্শকরা অধীর আগ্রহে টিভি সেটের সামনে বসে থাকেন এ বুলেটিন শোনার জন্য। বুলেটিন শেষে মানুষ একে অন্যকে প্রশ্ন করেন, আজকে কতজন মারা গেলেন? করোনাকালে এই সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়েছিল মানুষ।

কিন্তু হঠাৎ করে এই বুলেটিন প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অচিরেই তা বন্ধ করা হচ্ছে বলে সোমবার জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বুলেটিন প্রচারের বদলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরা হবে।

দেশে কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়িয়ে যাওয়া এবং প্রায় প্রতিদিনই ৩০-এর বেশি মৃত্যুর মধ্যে এ বুলেটিন প্রচার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন– কেন এই সিদ্ধান্ত?

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র বলছে, মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতরের বুলেটিন বন্ধ হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় এখন আর এমন বুলেটিন প্রচার করার প্রয়োজন দেখছেন না তারা। তার ভাষায়, ‘চার-পাঁচ মাস ধরে তো বুলেটিন প্রচার হলোই। এখন তো আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো। আমরা মনে করি, এখন সংক্রমণ কমে আসছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে। এ কারণে আমাদের সিদ্ধান্ত নিয়মিত একজন ব্যক্তি দিয়ে বুলেটিন না করে প্রেস রিলিজ দেয়া।’

শুরুতে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং চলছিল। একপর্যায়ে তা অনলাইনে সম্প্রচারিত হলেও সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল। কিন্তু গত ৮ এপ্রিল থেকে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ বন্ধ রেখে শুধু প্রতিদিন বেলা আড়াইটায় বুলেটিন চালু রাখা হয়েছিল।

শুরুতে এ ব্রিফিংয়ে আসতেন আইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। মাঝেমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদও আসতেন বুলেটিনে। পরে হঠাৎ এই দুজন বুলেটিনে কথা বলা বন্ধ করে দেন। এরপর অধিকাংশ দিনই সর্বশেষ তথ্য নিয়ে হাজির হচ্ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা।

বুলেটিন বন্ধ হলে দেশবাসী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে হবে। এখন থেকে দৈনিক একটি নির্দিষ্ট সময়ে তথ্য একটি লিখিত প্রেস রিলিজ আকারে আসবে। এটি দুয়েক দিনের মধ্যেই কার্যকর হয়ে যাবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

বাস্তবতা আর রাষ্ট্রের বয়ানের মধ্যে ফারাক জনগণ ভালোভাবেই বোঝেন। সাধারণত এ দেশে যেকোনো দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা নিয়ে একেক সংবাদ মাধ্যম একেক সংখ্যা উল্লেখ করে থাকে। আর এখন একটি বিশেষ পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বই অতিক্রম করছে। মহামারীর এই সময়ে স্বাস্থ্য বুলেটিন বন্ধ পরিস্থিতিতে কোনো উন্নতি বয়ে আনবে না। রাষ্ট্র বরং আরও দায়হীন হয়ে উঠবে এ আচরণে। করোনা টেস্ট কমিয়ে দেওয়া, সংক্রমণের সংখ্যা কম বলা ও মৃত্যু চেঁপে যাওয়া এ অভিযোগ তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে আছেই। এক কথায় এ মহামারী উলঙ্গ করে দিয়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যু যখন কেবল মাত্র একটি সংখ্যার আকারে বন্দি তখন স্বাস্থ্য বুলেটিনও বন্ধ করা একটি দায়িত্বহীনতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। অবিশ্বাস্য হলেও গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে এ নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ চোখে পড়েনি।

সরকার একদিকে বলছে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা। প্রযুক্তিতে ভর করে যেখানে সরকার মানুষের দুয়ারে যাবে। কিন্তু এই করোনাকালে স্বাস্থ্য বুলেটিন বন্ধ করা কি এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যায়?

তাই অবিলম্বে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ রেখে স্বাস্থ্য বুলেটিন চালু করা এখন জরুরি। অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ না- এ প্রবাদ কি নীতি নির্ধারকদের অজানা?

হাসান শাওন
লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]

Spread the love

Facebook Comments