করোনার সঙ্গে কীভাবে ফাইট করতে হয়!

গতরাতে লিখেছি তাঁর অনুমতি পেলে আমি লিখব! তাই কিছুটা লিখছি। একটু আগে ফোনে কথা হলো মুরুব্বির সঙ্গে। মুরুব্বির বয়স ৭৯। অভিনয় করেন, অনেকেই চেনেন। আমাদের ব্যয়বহুল ছবি ‘কাঁটা’র শুটিং শেষ হয়ে গেছে বেশ আগেই এবং করোনাজনিত কারণে পোষ্ট প্রোডাকশনের কাজ সাময়িকভাবে থমকে আছে। মুরুব্বি অনেক কষ্ট করেছেন এ ছবির শুটিং পিরিয়ডে।

গতকাল তাঁর সঙ্গে আমার ফোনে চারবার কথা হয়। যদিও এর প্রায় ১৮ দিন আগে তিনি আমাকে ফোন করেন এবং বলেন, ‘খুব জ্বর-ঠান্ডা, কাশি হচ্ছে।’

সব শুনে আমার মনে হচ্ছিল, করোনা সিমটম। বললাম, ‘করোনা হলো কিনা! মহাখালিতে যাবেন? আইইডিসিআর-এ টেস্ট করাবেন?’ মুরুব্বি আঁতকে উঠলেন, বললেন, ‘শোনেন, আপনাকে আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু ওদের বিশ্বাস করা যায়? আইসোলেশনের নামে কোথায় নিয়ে গিয়ে রাখে না রাখে! যতটা ক্যামেরার সামনে ওদের বাগাড়ম্বর আর বাস্তবতায় কতটুকু দায়িত্বশীল, বুঝতে পারছেন না?’

বললাম, ‘তাহলে আপনার চিকিৎসা কীভাবে হবে, কিছু ভাবছেন?’
মুরুব্বি জানালেন, ‘কিছু টাকার সাপোর্ট দরকার এ মুহূর্তে। আমার এক ডাক্তারবন্ধু বলেছেন বাসাতেই আইসোলেশন করে থাকুন, সিমটম অনুযায়ী ওষুধ দিয়েছেন, তাই খাচ্ছি, তাই খাব।’

আমার আর বলার কিছু থাকেনি, এসব কথা ছিল ১৮ দিন আগের। গতকাল সন্ধ্যায় আবার ফোনে কথা হয়, মুরুব্বি জানান, ‘আমি সুস্থ্য আছি, ভালো আছি। দোয়া করবেন।’ তাই গতকালের স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম, তাঁর অনুমতি পেলে আজ তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেব। এরপর একটি ইংরেজি দৈনিকের সাংবাদিক অনুজ-বন্ধু আমাকে জানান, তিনি মুরুব্বিকে কভার করবেন। আমার গত স্ট্যাটাসেও আরেকজন লিখেছেন, তিনিও কভার করবেন মুরুব্বিকে। খুশির কথা। সবাইকে জানানোর আছে নিশ্চয়ই। সেসব জানিয়ে আজ যখন আমি তাঁকে ফোনে বললাম, সবাই তো খুশি। আপনি সুস্থ্য হয়ে উঠছেন। পত্রিকা ইন্টারভিউ নেবে_কিভাবে করোনার সঙ্গে লড়াই করলেন!’

কাঁটা ছবির শুটিংয়ের একটি দৃশ‌্য।

মুরুব্বি জানান, ‘ওকে, ইন্টারভিউ নিলে নেবে। আমি প্রস্তুত। তবে ব্যাপারটা কি, একটা নিউক্লিয়ার বোমার চেয়েও মানুষের মনের শক্তি অনেক বেশি, এটা আমি বলব, মনকে সতেজ রাখতে হবে। আত্মবিশ্বাস হারানোর কোনো জায়গা নেই। তবে অবশ্যই মনের শক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে কাছের মানুষ যারা, তারা। আমার এই বয়সে আমি মোটেও মনোবল হারাইনি। লকডাউনের মধ্যেই শুটিঙে গিছলাম। টানা ২৬ ঘণ্টা শুটিংএ ছিলাম। কি করব,কাজ করেই তো খাই, কাজ না করলে বাঁচব কিভাবে? বাড়িতে এসেই জ্বরে পড়লাম। আমার ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শে বাড়ির দোতলায় একটি সিঙ্গেল রুমে আমাকে রাখা হলো। বাড়ির লোকেরা আমাকে বুঝতেই দেয়নি, আমার কোনো অসুখ হয়েছে। সারাক্ষণ আমার থেকে নিদিষ্ট দূরত্বে থেকেও আমাকে তারা মানসিক সাপোর্ট দিয়ে গেছে। তাতে আমার মনোবল আরো চাঙ্গা ছিল। আগেই তো বললাম, আধুনিক বিজ্ঞানের তৈরি ১০০ টা অ্যাটম বোমার চেয়েও একজন মানুষের মনের শক্তি বেশি, এটা এখন আমি আরো বেশি করে বিশ্বাস করি। আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষের মন অনেক বেশি ভূমিকা রাখে জীবনে, এই কথাটা সবাইকে জানানো দরকার। কিছুতেই ভেঙে পড়া চলবে না। আপনাকে দাদা আমি আর কি বলব, আপনি তো সিনেমা বানাচ্ছেন, কবিতা লেখেন, আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশিই জানেন।, পাশে থাকবেন, সবাইকে নিয়েই তো বাঁচতে হবে, সবাইকেই ভালো থাকতে হবে, ভালো থাকতে সাপোর্ট দিতে হবে। তা না হলে আমরা মানুষ হই কীভাবে? দাদা, দোয়া করবেন, সবাই যেন ভালো থাকে। আপনিও ভালো থাকুন।’

এই পর্যন্তই কথা, কথা হয়তো আবার হবে। আমি শিখেছি করোনাজয়ী মুরুব্বির কাছে। আমি মন আর নিউক্লিয়ার বোমার পার্থক্যটা পুনরায় বুঝতে চেষ্টা করছি। আমার আবার সেই পুরোনো প্রবাদটি মনে পড়ছে ‘সমাজের একজন বয়স্ক মানুষ একটি বড় লাইব্রেরির সমান, কখনো হয়তো লাইব্রেরির চেয়েও বেশি কিছু দিতে পারে আমাদের।’

টোকন ঠাকুর
কবি ও নির্মাতা
২৮ এপ্রিল, ২০২০
হাতিরপুল, ধানমন্ডি

Facebook Comments