করোনাভাইরাসের ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে এখনো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কেউ শনাক্ত হয়নি। সরকার বেশ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে ঝুঁকি আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ১৪ দিনে সন্দেহভাজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৩৯ জনের লালার নমুনা পরীক্ষা করেছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশে কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়নি। আইইডিসিআর এ তথ্য জানিয়েছে।

চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে আরও ১৭১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসতে চাইছেন। তবে সেখান থেকে যাঁরাই আসবেন, তাঁদের সবাইকে ১৪ দিন উত্তরার আশকোনায় বিশেষ ক্যাম্পে রাখা হবে। বাংলাদেশে যাতে করোনাভাইরাস না আসতে পারে, সে জন্য প্রতিরোধমূলক যত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা নেবে সরকার। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় এ সিদ্ধান্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। পরে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ-সংক্রান্ত নানা তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

চীনের হুবেই প্রদেশ থেকে আরও ১৭১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসতে চাওয়ার তথ্য জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশ থেকে উড়োজাহাজ পাঠাতে একটু সমস্যা হচ্ছে। কারণ, একবার উড়োজাহাজ চীনে গেলে সেই পাইলটকে অন্য কোনো দেশ ঢুকতে দিচ্ছে না। তাই চীনের কোনো এয়ারলাইনসের ভাড়া করা উড়োজাহাজে বাংলাদেশিদের আনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এদিকে আশকোনা হজ ক্যাম্পে আলাদা করে রাখা চীনফেরতদের মধ্যে একজনের জ্বর হয়েছে। তাঁকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ওই হাসপাতালে ভর্তি থাকা আটজনের মধ্যে একজন ছাড়া অন্য সবাইকে হজ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনটি পরিবারের আটজন ভর্তি আছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

২১ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৯৫২ জন চীন থেকে এসেছেন। আরও ১৭১ জন ফেরার অপেক্ষায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ঝুঁকি আছে। যাঁদের কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কেউ আক্রান্ত কি না, তা ১৪ দিনের মধ্যে বোঝা যাবে। অন্যদিকে এখনো নতুন অনেকেই চীন থেকে আসছেন। তাঁদের কেউ আক্রান্ত কি না, তা জানা নেই। সুতরাং সর্বোচ্চ সতর্কতাই কাম্য।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ২০ জন চীনা নাগরিককে বিশেষ ব্যবস্থায় আলাদা করে রাখা হয়েছে। গতকাল ওই কেন্দ্রে সব ধরনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে একটি সচেতনতামূলক সভা হয় বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২ হাজার ৭০০ চীনা নাগরিক আছেন।

গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের মানুষ নতুন ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হতে থাকে। ৩১ ডিসেম্বর বিশেষজ্ঞরা জানতে পারেন, ভাইরাসটি একেবারে নতুন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম রাখে ‘২০১৯-এনসিওভি’।

চীনের বিভিন্ন শহরে এবং বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৩০ জানুয়ারি বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। নতুন এই ভাইরাসের উৎপত্তির সুনির্দিষ্ট উৎস এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তবে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ায় এমন ভাইরাসের সঙ্গে নতুন ভাইরাসের কিছুটা মিল আছে।

চীনে রোববার সন্ধ্যা থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৮০০ জন। সংক্রমণ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। আর ওই ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৫৭ জন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো চীনে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। সাংহাইসহ চীনের বড় বড় শহরের রাস্তা এখন ফাঁকা। যতটা সম্ভব ঘরে থাকছে মানুষ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে।

এ ছাড়া চীনে অবস্থানরত অন্যান্য দেশের নাগরিকেরা নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে শুরু করেছেন। ১ ফেব্রুয়ারি উহান শহর থেকে ৩১২ জন নাগরিককে ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশ। গতকাল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ওই ৩১২ জনকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

আইইডিসিআর সূত্র জানিয়েছে, ২১ ডিসেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত ৫ হাজার ৯৫২ জন যাত্রী চীন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। বিমানবন্দরে এঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সন্দেহভাজন প্রত্যেকের ‘২০১৯-এনসিওভি’ শনাক্তের পরীক্ষা হয়েছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন করোনাভাইরাস শনাক্তের সুনির্দিষ্ট রিএজেন্ট আইইডিসিআরের কাছে পৌঁছেছে।

গতকাল বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে করোনাভাইরাস নিয়ে এক আলোচনা সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনাভাইরাসের ব্যাপারে সরকার সজাগ ও সতর্ক আছে। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, করোনাভাইরাস নিয়ে ভয় পাওয়ার মতো এখনো কিছু হয়নি। এটি ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো একটি রোগ। তবে সতর্ক হতে হবে সবাইকে।

Facebook Comments